বগুড়া নন্দীগ্রাম উপজেলা

বগুড়া নন্দীগ্রাম উপজেলা পরিচিত

নন্দীগ্রাম উপজেলা, জনশ্রুতিতে যার পূর্ব নাম ছিলো নন্দিনির গ্রাম। ইতিহাস থেকে জানা যায়, অযোদ্ধার রাজা দশরথের দ্বিতীয় স্ত্রী নন্দিনির পৈত্রিক নিবাস ছিলো এই নন্দীগ্রাম উপজেলায়। তাই রাজা দশরথ তার স্ত্রীর সৌজন্যে এই এলাকার নামকরণ করেন নন্দিনির গ্রাম নামে। পরবর্তীতে নন্দিনির গ্রাম নামটিই নন্দীগ্রাম নামে রুপান্তরিত এবং জনসাকুল্যে পরিচিতি লাভ করে।

নন্দীগ্রাম উপজেলা আয়তনের দিক থেকে বগুড়া জেলার অন্যতম দ্বিতীয় বৃহত্তম উপজেলা। পূর্বেকার সময়ে ব্রিটিশ আমলে এ উপজেলাটি মূলত রাজশাহী জেলার নাটোর মহাকুমার সিংড়া থানার অন্তর্ভক্ত ছিল। যা ১৯৩৭ সালে সিংড়া থানা হতে আলাদা হয়ে ৫টি ইউনিয়নের সমন্বয়ে নন্দিগ্রাম থানা হিসাবে বগুড়া জেলার অন্তর্ভূক্ত হয়। অতঃপর থানাকে উপজেলায় রূপান্তর করা হয় ১৯৮৩ সালে। এই উপজেলাটি বগুড়া সদর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। 

ভৌগলিক অবস্থান ও আয়তন

বগুড়া জেলার নন্দীগ্রাম উপজেলার উত্তরে শাজাহানপুর ও কাহালু উপজেলা, দক্ষিণে নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলা, পূর্বে শেরপুর উপজেলা এবং পশ্চিমে আদমদীঘি উপজেলা ও নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলা রয়েছে। এর সর্বমোট আয়তন ২৬৬ বর্গ কিঃমি। এই উপজেলাটির অবস্থান: ২৪°৩৫´ থেকে ২৪°৪৮´ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৯°০৮´ থেকে ৮৯°২১´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ। 

জনসংখ্যার উপাত্ত

বগুড়া জেলার অন্যতম এ উপজেলা নন্দীগ্রামের সর্বমোট জনসংখ্যা ১,৮৭,৯৪০ জন(আদিমশুমারী ২০১১); তন্মধ্যে পুরুষ ৯৩৯৮০ জন এবং মহিলা ৯৩৯৬০ জন। এই উপজেলায় লোক সংখ্যার ঘনত্ব কিলোমিটারে ৬৩৩জন ওমাইলে ১৬৪১জন। সর্বমোট ভোটার সংখ্যা রয়েছে ১,২০,১১১ জন; এর মধ্যে পুরুষ ভোটার সংখ্যা রয়েছে ৫৮,১৫০ জন এবং মহিলা ভোটার সংখ্যা রয়েছে  ৬১,৯৬১। বাৎসরিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার শুন্য। এবং মোট পরিবার রয়েছে ৩৭,০৪২ টি। 

ইতিহাস ও ঐতিহ্য

ইতিহাস থেকে নন্দীগ্রাম উপজেলার এক করুণ ও মর্মান্তিক পর্যালোচনা পাওয়া যায়। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ১৯৭১ সালের ২৮ এপ্রিল নন্দীগ্রাম উপজেলার বামন গ্রামে পাকিস্তানি পাকবাহিনী একটি গণহত্যা চালায়। উক্ত গণহত্যায় প্রায় ১৫৭ জন সাধারণ ও নিরীহ লোকদের তারা নির্মমভাবে মেরে ফেলে। এছাড়াও ওই সময় পাকবাহিনীর সাথে লড়াইয়ে একজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। অতঃপর এক দীর্ঘ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে পরিশেষে ১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর এই উপজেলাটি পাকবাহিনী শত্রুমুক্ত হয়। এছাড়াও এই উপজেলায় বামন গ্রামে ১টি গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায়। 

সম্পূর্ন শত্রুমুক্তির পর সময়ের সাথে ধীরে ধীরে এই উপজেলাটি রুপ নেয় একটি শান্তিপূর্ণ নিবিড় পল্লী জনপদে। এখানে বেশকিছু ঐতিহাসিক স্থান ও স্থাপত্য রয়েছে। এখানকার ঐতিহ্য হিসাবে বেশ কয়েকটি পুকুরের দেখা মেলে যা অতীতে বিভিন্ন রাজা ও জমিদারগণ তাদের জলতৃষ্ণা নিবারণ এবং প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহারের জন্য খনন করেছিলেন। এগুলোর আবার বিভিন্ন নামও রয়েছে, যেমন: পাঁচঘটি পুকুর, সুখ-দুখ পুকুর, গোছনের ছয়ঘটি, মুরাদপুরের বান্দির পুকুর ইত্যাদি। 

এছাড়াও এ এলাকায় আরেকটি ঐতিহাসিক স্থাপত্য রয়েছে যার নাম থালতেশ্বরী কালীমাতার মন্দির। এই মন্দিরটি প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো সনাতন ধর্মের মানুষের প্রধান তীর্থস্থান। শুধুমাত্র এটাই শেষ নয়, বরং নন্দীগ্রামের বুড়ইল ইউনিয়নের হাজারকী গ্রামেও দেখা মেলে একটি ছোট ঐতিহাসিক জামে মসজিদ। যা আলিয়ার নামক পুকুড়পাড়ে একটি ঐতিহ্যবাহী মসজিদ হিসেবে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আজো। 

আলিয়া পুকুর জামে মসজিদ

এটি মূলত নন্দীগ্রাম উপজেলার বুড়ইল ইউনিয়নের হাজারকী গ্রামে অবস্থিত। এখানে যেতে হলে নন্দীগ্রাম বাসস্ট্যান্ড থেকে ধুন্দার পর্যন্ত সিএজিতে যেতে হবে। সেখান থেকে অটোরিক্সা বা অটো ভ্যানে করে হাজারকী গ্রামে যেতে হবে। 

থালতেশ্বরী কালীমাতার মন্দির

এর অবস্থান থালতা মাজগ্রাম ইউনিয়নের থালতা মাজগ্রাম গ্রামে। এখানে যেতে হলে নন্দীগ্রাম বাসস্ট্যান্ড থেকে সিএনজি বা রিক্সা যোগে প্রথমে  কড়ইহাট বাজারে যেতে হবে। তারপর সেখান থেকে অটোরিক্সা বা  অটোভ্যানে করে থালতা মাজগ্রাম গ্রামে যেতে হবে।  জানা যায়, এই মন্দিরটি প্রায় দু্ইশত বছরের পুরানো। যা জমিদার খিতিষ ভূষন রায় রাহাদুর প্রতিষ্ঠিত করেন। এই মন্দিরটি প্রায় ৩০ শতাংশ জায়গার উপর প্রতিষ্ঠিত। 

শিববাটি মন্দির

ঐতিহ্যবাহী এবং বেশ পুরনো এই মন্দিরটি নন্দীগ্রাম উপজেলার বুড়ইল ইউনিয়নের পেং হাজারকী গ্রামে অবস্থিত। যোগাযোগঃ  নন্দীগ্রাম বাসস্ট্যান্ড থেকে সিএজি যোগে ধুন্দার পর্যন্ত যেতে হবে। এরপর সেখান থেকে অটোরিক্সা বা ভ্যানে করে হাজারকী গ্রামে যেতে হবে। 

সুখ-দুখ পুকুর

এই পুকুরটি মূলত নন্দীগ্রাম উপজেলার ভাটরা ইউনিয়নের বামনগ্রামে অবস্থিত। জনশ্রুতিতে জানা যায়, একসময় নাকি এই ভাটরা ভাটরা ইউনিয়নের চালা মোকামতলায় এক রাজা ছিল। তারই দুই মেয়ের নামানুসারে এই দুই পুকুরের নামকরণ করা হয় সুখ পুকুর এবং দুখ পুকুর। পুকুর দুটি পাশাপাশি অবস্থিত। প্রায় ৩৬৬ বিঘা মাটিতে এই পুকুরটি খনন করা হয়েছিলো। এর পুকুর দুটির মাঝখানে ছোট্ট একটি ব্রীজও ছিলো। তবে পুকুর দুটির বয়স্কাল সম্পর্কে কেউ জানে না।। তবে, পরবর্তীকালে পুকুর দুটি সংস্কারের সময় প্রাচীন আমলের ইটের খোঁজ পাওয়া যায়। সেখান থেকে ধারণা করা হয় পুকুর দুটি প্রায় পাঁচশত বছরের পুরনো।  ঐতিহ্যবাহী এই পুকুর ‍দর্শনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীদের ভিড় চোখে পড়ার মতো।

নন্দীগ্রাম পৌর শহর থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার পশ্চিমে এই পুকুরটি অবস্থিত। নন্দীগ্রাম বাসস্ট্যান্ড থেকে সিএনজি বা অটোরিক্সা করে কালিগঞ্জ রোডে বামনগ্রামের রাস্তার পার্শ্বে নামতে হয় । এরপর সেই বামনগ্রামের রাস্তা  ধরে ৪০০গজ সামনে গেলেই  সুখ-দুখ পুকুরের দেখা পাওয়া যাবে।

দেওতা মাজার শরিফ

এই মাজারটি  নন্দীগ্রাম উপজেলার ভাটগ্রাম ইউনিয়নের দেওতা গ্রামে অবস্থিত। যা বগুড়া জেলা থেকে প্রায় ৩৯ কিলোমিটার দূরে। 

শিক্ষা 

প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যে ভরপুর মনোরম ও নিবিড় পল্লী জনপদের এই উপজেলায় বর্তমানে শিক্ষার হার ৪৭.৫%; তন্মধ্যে পুরুষ ৫১.৭%, এবং মহিলা ৪৩.৪%।। বগুড়ার অন্যান্য উপজেলার মতো এই উপজেলাও শিক্ষার দিক থেকে কোনো দিক থেকেই পিছিয়ে নেই। এই উপজেলাটিতে বর্তমানে মোট সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১০৬ টি, উচ্চ বিদ্যালয় ২৪ টি, বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ২ টি, দাখিল মাদ্রাসা সংখ্যা ১২টি, আলিম মাদ্রাসা রয়েছে ৩ টি, ফাজিল মাদ্রাসা ৪ টি, এবতেদায়ী মাদ্রাসা সংখ্যা ২২ টি, এবং সর্বমোট কলেজের সংখ্যা ৫ টি তন্মধ্যে মহিলা কলেজ ১ টি। 

অর্থনীতি

এই উপজেলাটির অর্থনীতি সাধারণত কৃষিনির্ভর, জনগোষ্ঠীর আয়ের প্রধান উৎসই হলো  কৃষি যা ৮১.৯৪%। এখানকার বেশিরভাগ লোক কৃষিপেশায় নিয়োজিত। এ উপজেলাটিতে মোট জমির পরিমাণ ৬০,৩৭৮ একর; তন্মধ্যে নীট ফসলী জমির পরিমাণ ৫৩,৫০৯ একর। এখানকার প্রধান কৃষি ফসলগুলো হলো ধান, গম, আলু, সরিষা, মরিচ, ডাল, এবং শাকসবজি।

ভাষা ও সংষ্কৃতি

বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চলে অবস্থিত নন্দীগ্রাম উপজেলাকে নাটরের উত্তরা গণভবণ,  রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের উপজেলাসমূহ ঘিরে রয়েছে । এ উপজেলার মানুষের ভাষার মূল বৈশিষ্ট্য অন্যান্য উপজেলার মতই। তবে কিছুটা বৈচিত্র্য খুঁজে পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরুপ কথ্য বা আঞ্চলিক ভাষার মধ্যে মহাপ্রাণধ্বনি এর অনুপস্থিতি অনেকাংশেই লক্ষ্য করা যায়। অর্থাৎ ভাষা সহজীকরণের প্রবণতা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ উপজেলার নাগর ও ভদ্রাবতি  নদীর গতিপ্রকৃতি নন্দিগ্রামের মানুষদের আচার-আচরণ, খাদ্যাভ্যাস, ভাষা ও সংস্কৃতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। 

প্রশাসনিক এলাকা

সর্বমোট ৩৯ টি নির্বাচনী এলাকা, ৪৪৫ টি গ্রাম, ২৩৫টি মৌজা, ৫টি ইউনিয়ন এবং  ১টি পৌরসভা নিয়ে এ উপজেলাটি গঠিত। ইউনিয়ন সমূহ  হলোঃ

১. বুড়ইল ইউনিয়ন

২. নন্দীগ্রাম ইউনিয়ন

৩. ভাটরা ইউনিয়ন

৪. থালতা মাঝগ্রাম ইউনিয়ন

৫. ভাটগ্রাম ইউনিয়ন

প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বসমূহ  

১. মাওলানা কুদরুতুল্লাহ কৃষ্ণপুরী (মৃত্যু- ১৯৮৫), গ্রাম-গুলিয়াকৃষ্ণপুর, ইসলামি ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, ইমাম, বক্তা, ও বিশিষ্ট সমাজসেবক।

২. এ.এইচ.এম. মিজানুর রহমান (জন্ম-১৫ ডিসেম্বর ১৯৭৩), এডভোকেট, সহকারী এটর্নি জেনারেল (২০০৫-২০০৭), বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট।  গ্রাম- গুলিয়াকৃষ্ণপুর।

৩. ড: এস এম শাহিনুর ইসলাম দুলাল (মৃত্যু ২০১০ অক্টোবর ১০), গ্রাম- মীরপাড়া চাংগুর, বিজ্ঞানী, গবেষক, শিক্ষক,  মেটারিয়াল সায়েন্স,  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। 

৪. ডাঃ জিয়াউল হক মোল্লা (সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা)।

৫. মরহুম আজিজুল হক মোল্লা (সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা)।

পরিশেষে

বগুড়া জেলার অন্তর্গত এই প্রশাসনিক নন্দীগ্রাম এলাকাটি সম্পূর্ণটি একটি মনোরম ও নিবিড় পল্লী জনপদ। নন্দীগ্রামের উপর দিয়ে বয়ে গেছে ভদ্রাবতী ও নগর এই দুটি নদী, যা এখন মৃতপ্রায়। কিন্তু তারপরও এই দুটি নদীকে এই উপজেলার মানুষগুরো পরম যত্নে জড়িয়ে রেখেছে। মনে হয় গ্রামীণ জনপদ এবং এই অঞ্চলের প্রকৃতির সাথে নন্দীগ্রাম নামটি যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *